১৬৪২ সালের বড়দিন। ইংল্যান্ডের এক নিভৃত গ্রাম উলসথর্প। সেদিন জন্ম নিল এক ক্ষীণকায়, দুর্বল শিশু—আইজাক নিউটন। জন্মের কয়েক মাস আগেই তাঁর পিতা মারা গিয়েছিলেন। নবজাতক নিউটন এতটাই শীর্ণ ও অসুস্থ ছিলেন যে পরিবার প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিল। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র শরীরেই লুকিয়ে ছিল এক বিশাল মন, যে মন একদিন মানব ইতিহাসের চিন্তাধারাকে আমূল বদলে দেবে।
বিধবা মায়ের সঙ্গেই কাটে তাঁর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর। পরে মা দ্বিতীয়বার বিবাহ করলে শিশু নিউটন হয়ে পড়েন অবাঞ্ছিত। তাঁকে দাদির কাছে রেখে মা নতুন সংসারে চলে যান। এই বিচ্ছেদ নিউটনের মনে গভীর একাকিত্বের বীজ বপন করেছিল—যা আজীবন তাঁর সঙ্গী হয়ে ছিল।
বারো বছর বয়সে গ্রাম্য স্কুলে ভর্তি হলেন নিউটন। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও মেধায় তিনি ছিলেন অনন্য। কিছুটা দুষ্টুমি থাকলেও তাঁর বুদ্ধিমত্তা শিক্ষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে গড়ে তুললেন নীরব, আত্মমগ্ন এক চিন্তকে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে পড়ার সময়ই তাঁর প্রতিভার প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। এই সময়ে তিনি আবিষ্কার করেন বাইনোমিয়াল উপপাদ্য, ফ্লাক্সন পদ্ধতি (যা আজ ইন্টিগ্রাল ও ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস নামে পরিচিত), এবং বক্ররেখার ক্ষেত্রফল ও ঘনবস্তুর আয়তন নির্ণয়ের পদ্ধতি। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে নিউটন লিখেছিলেন—ফ্লাক্সনের ধারণা উদ্ভবের সঙ্গেই তাঁর মনে মহাকর্ষের প্রশ্ন জেগে উঠেছে।
১৬৬৭ সালে, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে, ট্রিনিটি কলেজ তাঁকে ফেলো নির্বাচিত করে—তৎকালীন সময়ে যা ছিল এক বিরল সম্মান। এরপর তিনি আলোর প্রকৃতি নিয়ে গবেষণায় মন দেন এবং এর ফলস্বরূপ তৈরি করেন প্রতিফলক দূরবীক্ষণ (Reflecting Telescope)। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের যাত্রাপথে এই আবিষ্কার এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
নিউটন কেমব্রিজে গণিতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং একই সঙ্গে আলো ও বর্ণচ্ছটা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। রয়াল সোসাইটি তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে তাঁকে সদস্যপদ প্রদান করে। এলোমেলো বেশভূষা, বোতাম খোলা জামা, অগোছালো চুল—এই মানুষটিই ছিল চিন্তার জগতে এক নিঃসঙ্গ সাধক।
একদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে একটি প্রিজম বিক্রি করতে এলে নিউটন দরদাম না করেই সেটি কিনে নেন। বাড়িওয়ালার কাছে তিনি বোকা প্রতিপন্ন হলেও, সেই সাধারণ কাচ থেকেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত বর্ণতত্ত্ব—প্রমাণিত হয় সাদা আলো আসলে বিভিন্ন বর্ণের সমষ্টি।
কলেজের ছুটিতে মায়ের বাড়িতে অবস্থানকালে প্রকৃতির সান্নিধ্যে তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। সেই সময়ই একদিন গাছ থেকে আপেল পড়তে দেখে তাঁর মনে জাগে সেই অমর প্রশ্ন—“কেন আপেলটি নিচের দিকেই পড়ল?” এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় মহাকর্ষ তত্ত্বের যাত্রা। যদিও এর পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পায় ১৬৮৭ সালে, তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ Philosophiae Naturalis Principia Mathematica-তে।
এই গ্রন্থে নিউটন তিনটি গতিসূত্র ও সর্বজনীন মহাকর্ষ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি দেখান—মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে; এই একই নিয়মে সূর্যের চারদিকে গ্রহ ঘোরে, চাঁদ ঘোরে পৃথিবীর চারদিকে, এমনকি জোয়ার-ভাটাও ঘটে।
Principia প্রকাশের পর বহু পাঠক বইটিকে জটিল ও দুর্বোধ্য বলে মনে করেছিলেন। এক বন্ধু যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন কীভাবে এই তত্ত্ব বোঝা সম্ভব, নিউটন মৃদু হেসে বলেছিলেন—“এর আগে আপনাকে অনেক কিছু শিখে নিতে হবে।”
বিজ্ঞানী হয়েও নিউটন রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি নিযুক্ত হন এবং ১৭০৫ সালে রানী অ্যানের কাছ থেকে নাইটহুড উপাধি লাভ করেন—সেই থেকে তিনি পরিচিত হন ‘স্যার আইজাক নিউটন’ নামে।
ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে লিবনিজের সঙ্গে তাঁর বিরোধ ইতিহাসে বিখ্যাত। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন—নিউটন ও লিবনিজ উভয়েই স্বাধীনভাবে এই শাখার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।
১৭২৭ সালের ২০শে মার্চ এই মহামনীষীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে সমাধিস্থ করা হয়—যেখানে শুয়ে আছেন ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা।
মৃত্যুর আগে নিউটন লিখেছিলেন—
“আমি নিজেকে মনে করি সমুদ্রতীরে খেলা করা এক শিশু, যে মাঝে মাঝে অন্যদের চেয়ে সামান্য সুন্দর একটি পাথর বা ঝিনুক কুড়িয়ে পেয়েছে। অথচ আমার সামনে পড়ে আছে এক বিশাল, অনাবিষ্কৃত সত্যের সাগর।”
এই বিনয়ী স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে—নিউটন ছিলেন কেবল এক বিজ্ঞানী নন, মানব জ্ঞানের এক চিরন্তন সাধক।
